এবার ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ ভাণ্ডারে বাংলাদেশ!

সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ ভাণ্ডারে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। ১৩ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ এ ধরনের দুটি ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত হলো। ২০০৫ সালে প্রথমবারের মতো সাবমেরিন ক্যাবলে অন্তর্ভুক্ত হয়। ওই ক্যাবলের মাধ্যমে প্রথমে ৪৪ দশমিক ৬ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ দেশে আসতো। পরে ক্যাবলটির আপগ্রেড করার পর এখন ২০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ দেশে আসছে। এর ১২ বছর পর চলতি বছর দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলে প্রবেশের ঘটনা ঘটলো। নতুন এ ক্যাবল থেকে পাওয়া যাবে ১৫শ’ জিবিপিএস। ২০১১ সাল থেকে এ প্রক্রিয়ার শুরু। শেষ হয় গত ২১শে ফেব্রুয়ারি। ওইদিন ইস্তাম্বুলে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বকে জানানো হয়, হাই ক্যাপাসিটির ব্যান্ডউইথ বহনকারী ক্যাবলের যাত্রার কথা। সিঙ্গাপুর থেকে শুরু হওয়া ব্যান্ডউইথ বহনকারী ওই ক্যাবল শেষ হয়েছে ফ্রান্সে। বাংলাদেশসহ ১৭টি দেশের ১৯টি টেলিকম কোম্পানি ওই ক্যাবলের মালিক। বাংলাদেশে এর ল্যান্ডিং স্টেশন করা হয়েছে সাগরকন্যা খ্যাত পটুয়াখালীর কুয়াকাটায়।

এরপর ওই ব্যান্ডউইথ ঢাকায় আনতে ২টি পরীক্ষা চালানো হয়। এরপরই ঘোষণা দেয়া হয়, ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের বিপুল ভাণ্ডার ব্যবহারে এখন প্রস্তুত বাংলাদেশ। ১৫ই মার্চের মধ্যে এর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপরই তা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার শুরু হবে। সরকারের তিনটি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তায় খুব অল্প সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। গতকাল কুয়াকাটায় ল্যান্ডিং স্টেশনের কার্যক্রম সরজমিন পরিদর্শন করেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম। তার সঙ্গে ছিলেন মন্ত্রণালয়, বিটিআরসি ও বিএসসিসিএলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। দিনভর তারা ব্যস্ত ছিলেন সাবমেরিন ক্যাবলের নানা স্থাপনা পরিদর্শনে। প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম এসময় সবকিছু মনোযোগ দিয়ে দেখেন ও কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। কুয়াকাটায় ১০ একর জমিতে দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের ল্যান্ডিং স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। এদিকে সাবমেরিন ক্যাবলে যুক্ত হওয়াকে বর্তমান সরকারের বড় ধরনের সফলতা বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। যুক্তি দেখিয়ে বলা হচ্ছে দেশে প্রথম যে সাবমেরিন ক্যাবল রয়েছে তার মেয়াদ আছে আর মাত্র ১০ বছর।

এরপর এমনিতেই আরেকটি সাবমেরিন ক্যাবলের প্রয়োজন হতো। সরকার সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলে যুক্ত হয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে সরকারের এ উদ্যোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেন, দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল নিয়ে সফল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে এতবড় কাজ কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান করতে পারে তার দৃষ্টান্ত এটা। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের জন্য এটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। শেষ পর্যন্ত সফলতার সঙ্গে করা সম্ভব হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, আশা করি দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে দেশের জনগণকে নিরবচ্ছিন্নভাবে ইন্টারনেট সেবা দেয়া সম্ভব হবে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে ইন্টারনেটের দাম আরো কমানো সম্ভব হবে। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠান এ থেকে যেন লোকসানের মুখে না পড়ে সেটাও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান যদি লাভবান হয় তাহলে সরকার ও জনগণ উভয়েই লাভবান হবে। তবে এ খাতে কাজ করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিও আমরা বৈরী নই। তবে সবার আগে গুরুত্ব দেয়া হবে জনসাধারণের স্বার্থকে। এদিকে বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মনোয়ার হোসেন বলেন,

বাংলাদেশে প্রথম সাবমেরিন ক্যাবলের ল্যান্ডিং স্টেশন কক্সবাজারে। সাইক্লোনে সেটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো। কিন্তু সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। এ কারণে কুয়াকাটায় দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের ল্যান্ডিং স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে একটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে আরেকটি দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা দেয়া সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলে যুক্ত হতে মোট খরচ হচ্ছে ৬শ’ কোটি টাকা। যদিও এর বাজেট ছিল ৬৬০ কোটি টাকা। ২০ হাজার কিলোমিটারের এ ক্যাবল নিয়ে যে কনসোর্টিয়াম তৈরি করা হয়েছে তা সি-মি-উই-৫ নামে পরিচিত। প্রথম সাবমেরিন ক্যাবলটি সি-মি-উই-৪ নামে পরিচিত। এদিকে দেশে এখন মোট ব্যান্ডউইথের চাহিদা ৪০০ জিবিপিএস। যার মধ্যে ২৮০ জিবিপিএস-ই আসে ভারতের দুটি সাবমেরিন ক্যাবল থেকে। অন্যদিকে বাংলাদেশে বর্তমানে মোট ব্যান্ডউইথের মধ্যে ব্যবহার হচ্ছে ১৭৬ জিবিপিএস। এর মধ্যে ভারতে রপ্তানি হচ্ছে ১০ জিবিপিএস। ব্যান্ডউইথের পরিমাণ বৃদ্ধি ও নতুন ব্যান্ডউইথ যুক্ত হওয়ায় তা বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করার কর্মপরিকল্পনা সাজাচ্ছে বিএসসিসিএল। এরইমধ্যে ভূটান, নেপাল ও মিয়ানমার বাংলাদেশ থেকে ব্যান্ডউইথ কেনার আগ্রহ জানিয়েছে। সম্প্রতি আসাম ১০০ জিবি ব্যান্ডউইথ নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে সরকারকে। কর্মকর্তারা জানান, সামনের দিনগুলোতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসবে ইন্টারনেট সেবার গুণগত মানে। ডেটা ও ভয়েস উভয় ক্ষেত্রেই তা পরিলক্ষিত হবে। প্রথম ও দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের সদস্য দেশগুলো হচ্ছে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, মিশর, ইতালি, তিউনিশিয়া, আলজেরিয়া ও ফ্রান্স। সি-মি-উই-৫ কনসোর্টিয়ামে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরবসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ নিয়ে। দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের মালিকও দ্বিতীয় কনসোর্টিয়ামের সদস্য দেশগুলো। বিএসসিসিএল দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত হতে ২০১১ সালের ২৮শে ডিসেম্বর সি-মি-উই-৫ সাবমেরিন ক্যাবলে কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে সিঅ্যান্ডএমএ চুক্তি সই করে। পরে কনসোর্টিয়াম নিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সি-মি-উই-৫ সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন সংক্রান্ত কার্যক্রম শুরু করে।

Zoombangla

Share This Post
About MainitBD Author

শিক্ষা জাতীর মেরুদন্ড! শিখবো, না হয় শেখাবো।

Leave a Comment